বিদায় আপসহীন নেত্রী *******এক নজরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর সকাল ৬টায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বিএনপির মিডিয়া সেলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। দলীয় সূত্র জানায়, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের প্রতীক। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দীর্ঘকাল সক্রিয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যান। বিএনপি ও বিভিন্ন জীবনীভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, তার জন্মনাম ছিল খালেদা খানম। পারিবারিকভাবে তিনি ‘পুতুল’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তার পিতা ইস্কান্দর মজুমদার এবং মাতা বেগম তৈয়বা মজুমদার। তাদের আদি বাড়ি ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর জননী। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করেই মূলত তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খানের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে স্থান করে নেন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্বল্পকাল তিনি ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে চারদলীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে তার এই শাসনামলসহ পুরো রাজনৈতিক জীবনজুড়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা বিতর্ক, আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি লাভ করেন। এরপর ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে আবারও কারাবন্দি হন। বিশেষ ব্যবস্থায় তিনি পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির প্রেক্ষাপটে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। এরপর একাধিকবার তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে তিনি কয়েক বছর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি। সর্বশেষ ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন ও একটি জনসমাবেশে তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেগম খালেদা জিয়া একদিকে ছিলেন দৃঢ়চেতা ও আপসহীন বিরোধী নেত্রী, অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের অংশীদার। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তার ইন্তেকালে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। দেশজুড়ে তার অনুসারী ও সহকর্মীদের মধ্যে শোক ও শোকস্তব্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে।

Comments